Wednesday, April 22, 2020

করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্ব । কখন কীভাবে করোনাভাইরাস মহামারীর সমাপ্তি ঘটবে?

করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্ব কখন কীভাবে করোনাভাইরাস মহামারীর সমাপ্তি ঘটবে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এতো বড় বিপর্যয়ে পৃথিবী আগে কখনো পড়েনি। পুরো পৃথিবীবাসী এখন অপেক্ষায় আছে এই দুর্যোগ কীভাবে শেষ হবে, কবে শেষ হবে, কতোটুকু ক্ষতির মধ্য দিয়ে শেষ হবে সেটা জানতে। আপাত দৃষ্টিতে সবাই মনে করেছিল যে, চীন, সিঙ্গাপুর এবং অন্যান্য এশীয় দেশসমূহ মনে হয় তাদের নিজ দেশে করোনাভাইরাস মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। কিন্তু, না! তারা এখন এই করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ধাক্কা সামাল দিচ্ছে। সুতরাং বলা চলে, যতদিন এই ভাইরাস পৃথিবীর কোথাও ছাইচাপা আগুনের মতো থাকছে সেখান থেকে দাবানলের মতো এই মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকবেই। ক্ষুদ্র এক ভাইরাস মোকাবেলায় যখন বিশ্বের একের পর এক বড় বড় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে মহামারী থেকে মুক্তি পাওয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা অনেক ধরণের সমাধানের পথ বাতলে দিচ্ছেন। সেগুলো মাথায় নিয়ে মোটা দাগে আমরা বলতে পারি আমাদের সামনে আসলে তিনটি রাস্তা খোলা আছে। এর মধ্যে প্রথমটি প্রায় অসম্ভব, দ্বিতীয়টি ভয়ংকর এবং তৃতীয়টি সময় সাপেক্ষ। শুরুতেই বলি প্রায় অসম্ভব প্রথম উপায়ের কথা। “এক পৃথিবী- এক গ্রাম” এই স্লোগানটির কথা আমরা নিশ্চয়ই জানি। যে বিশ্বায়নের বদান্যতায় এই ভাইরাস এতো দ্রুততার সঙ্গে সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে, সেই একই বিশ্বায়নের মূলমন্ত্রকে ধারণ করে সারা বিশ্বের সব দেশ যদি একই সঙ্গে, একইভাবে একটি দেশের মতো কাজ করা শুরু করে তাহলে আমরা এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে পারি। সেজন্য প্রয়োজন অনুসারে সম্পদ ও জনবল একদেশ থেকে আরেক দেশে স্থানান্তর করতে হবে। আমরা জানি, সব দেশের সক্ষমতা এক নয়। এখন যে দেশগুলো মহামারীতে একদম কাবু হয়ে আছে, যাদের মহামারীর অবস্থা তাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছে, সেইসব দেশকে যদি বাকিসব দেশ তাদের টেস্টিং কিট, পিপিই, মাস্ক, ভেন্টিলেটর মেশিন, ডাক্তার, নার্সসহ প্রয়োজনীয় সকল সম্পদ ও লোকবলের যোগান দেয় এবং পরবর্তীতে একইভাবে যে দেশই আক্রান্ত হবে সেইসব দেশগুলোও যদি এই সহযোগিতা পায় তাহলে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এটি প্রায় অসম্ভব একটি ভাবনা। এর পরের সম্ভাব্য উপায়টি হচ্ছে হার্ড ইমিউনিটি (Herd Immunity)। যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ শুরুতে এই উপায়ে মহামারী মোকাবেলা করতে চেয়েছিল। কিন্তু এর ভয়াবহতা দেখে সেসকল দেশ পিছু হটতে বাধ্য হয়। প্রথমেই চলুন জেনে নিই হার্ড ইমিউনিটি কী সে সম্পর্কে। সহজ ভাষায় বললে, যখন একটি জনপদের বা দেশের বেশিরভাগ বাসিন্দাদের একটি রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউনিটি গড়ে ওঠে তখন বাকি বাসিন্দারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই রোগের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি পেয়ে যায়। একে হার্ড ইমিউনিটি বলে। হার্ড ইমিউনিটি দুইভাবে অর্জন করা যায়। এক, দেশের বেশিরভাগ মানুষ জীবাণুর সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হওয়ার ফলে। দুই, দেশের বেশিরভাগ মানুষকে ভ্যাকসিন বা টিকা প্রদানের মাধ্যমে। যেহেতু এখনো নভেল করোনাভাইরাসের কোন ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি তাই আমরা হার্ড ইমিউনিটি বলতে বেশিরভাগ মানুষের জীবাণুর সংস্পর্শে আসাকে বুঝাচ্ছি। এই বেশিরভাগ মানুষের সংখ্যাটা একেক রোগের ক্ষেত্রে একেক রকম। এটা নির্ভর করে একজন অসুস্থ ব্যক্তি কয়জনকে রোগটি ছড়ায় তার ওপর। এপিডেমিওলজিস্টরা হিসেব নিকেশ করে বের করেছেন করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ৭০%। অর্থাৎ বাংলাদেশের ৭০% মানুষের করোনাভাইরাসে সংক্রমণ হয়ে গেলে ভাইরাসটি আর নতুন কাউকে সংক্রমিত করবে না। করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রকৃতি হলো, আক্রান্তের শতকরা ২০ জনের মধ্যে সংক্রমণের উপসর্গ প্রকাশ পায়। এবং মোট আক্রান্তের ৫% রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে, যাদের বেশিরভাগেরই ভেন্টিলেশন সাপোর্ট লাগে। শতকরা হিসেবে ৫% সংখ্যাটা অনেক কম মনে হলেও বাস্তবতায় এর ব্যাপ্তি (ম্যাগনিচিউড) আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধারণক্ষমতা এবং সামগ্রিক সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। বাংলাদেশের কথাই ধরি। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি হলে এর ৭০% প্রায় ১২ কোটি। ১২ কোটির ৫% প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ। অর্থাৎ এই মহামারীতে বাংলাদেশের প্রায় ৬০ লাখ মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। যেহেতু এটি একটি শ্বাসতন্ত্রের অসুখ, তাই যারাই হাসপাতালে ভর্তি হবে তাদের প্রায় সবার অক্সিজেন সাপোর্ট লাগবে এবং এদের বেশিরভাগেরই মেকানিকাল ভেন্টিলেশন সাপোর্টের প্রয়োজন পড়বে। করোনাভাইরাস খুবই উচ্চমাত্রার সংক্রামক জীবাণু। প্রতি ৩ দিনে এই ভাইরাস তার সংখ্যা দ্বিগুণ করে এবং ১ জন থেকে অতি দ্রুত সেটি ৩ জনে ছড়ায় তাই অংক কষে বলা যায় বাংলাদেশের ৭০% জনগণকে সংক্রমিত করতে আমাদের প্রায় দুই মাস সময় লাগবে। সুতরাং দুই মাসে সারা দেশে ৬০ লক্ষ গুরুতর অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা আমাদের করতে হবে, যাদের প্রায় সবাইকেই আইসিইউতে চিকিৎসা দিতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একই সঙ্গে এতো রোগীর চাপ নিতে সক্ষম নয়। এতে করে অনেক রোগী চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাবে। মহামারী শেষ হওয়ার দ্বিতীয় পদ্ধতিটি তাই খুবই ভয়াবহ। লক্ষ লক্ষ মানুষের বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার বিনিময়ে এই হার্ড ইমিউনিটি অর্জন মেনে নেয়া সম্ভব না। এবার আসি তৃতীয় উপায়ে। যদি কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা যায় তাহলে আমরা এই মহামারী থেকে মুক্তি পেতে পারি। এটি সবচেয়ে ভালো উপায় কিন্তু কতদিন সেটা সম্ভব হবে তা আমরা কেউ জানি না। অনেক জীবাণুর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন এই পৃথিবীতে আছে। তবে করোনাভাইরাসের বিপরীতে কোন ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তাই বিজ্ঞানীদের একদম অ আ ক খ থেকে কাজ শুরু করতে হচ্ছে। যদিও বিজ্ঞানীরা দিন রাত খেটে চলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ করোনাভাইরাসের জিন সিকুয়েন্সিং করার মাত্র ৬৩ দিনের মাথায় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য মানবশরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. ফাউসি বলেছেন, “এটি একটি অভাবনীয় বিশ্ব রেকর্ড।” তবে এর পরের ধাপগুলো হয়ত অতো দ্রুততার সঙ্গে হবে না। প্রাথমিক এই ট্রায়ালে সফলতা আসলে গবেষকরা অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করবেন। কাদের এই ভ্যাকসিন দেয়া যাবে, কাদের দেয়া যাবে না, বিভিন্ন বয়সে, বিভিন্ন ওজনে ভ্যাক্সিনের ডোজ কেমন হবে, এই ভ্যাকসিন কয়বার দিতে হবে, এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলো কী হতে পারে ইত্যাদি। সবগুলো ধাপ ঠিকঠাক পার হলেও সারা বিশ্বের জন্য কয়েকশ’ কোটি ভ্যাকসিন তৈরি করা মোটেও সহজ হবে না। মডার্না যে কার্যপদ্ধতি ব্যবহার করে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে সেটার বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য নতুন করে প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে। এটা অনেক সময় সাপেক্ষ। এই বিষয়টি মাথায় রেখে ফ্রান্স হামের ভ্যাক্সিনের সঙ্গে মিল রেখে এমনভাবে ভ্যাকসিন ডিজাইন করছে যাতে সারা বিশ্বের সকল হাম ভ্যাকসিন প্ল্যান্ট থেকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি করা যেতে পারে। তবে যে পদ্ধতিতেই ভ্যাকসিন তৈরি হোক না কেন সেটা এক থেকে দেড় বছরের আগে হাতে পাওয়া সম্ভব না। এরপরে বাণিজ্যিক উৎপাদন তো বাকিই থাকলো। এই ভাইরাসটি একদম নতুন হওয়ায় এটি সম্পর্কে এখনো শতভাগ জানা সম্ভব হয়নি। যতটুকু জানা গেছে তাতে এই তিনটি ছাড়া আর কোন পথ এখন আমাদের সামনে খোলা নেই। প্রথম উপায়ের ব্যাপারে বিশ্ব নেতাদের তেমন কোন পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। তাই সেটা বাতিলের খাতায় ফেলা যায়। অনেক দেশ লকডাউন এবং অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে আক্রান্তের সংখ্যা তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতার ভেতরে রাখছে। এটাকেই ‘ফ্ল্যাটেনিং দ্যা কার্ভ’ বলা হচ্ছে। তারাও হার্ড ইমিউনিটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু ধীরে ধীরে যেন বিনা চিকিৎসায় কেউ মারা না যায়। যেসব দেশে নাগরিক ক্ষমতায়ন নেই এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুবই দুর্বল তারা হয়ত সরাসরি হার্ড ইমিউনিটির দিকে এগিয়ে যাবে। বাকিরা অপেক্ষা করবে ভ্যাকসিনের জন্য, ততদিন করোনভাইরাসের সঙ্গে লকডাউন নামক লুকোচুরি খেলা চলবে। কোন দেশ কতদিন এই খেলা চালিয়ে নিতে পারে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Wednesday, April 8, 2020

পৃথিবীতে কমেছে মানুষের আস্ফালন অহঙ্কার । করোনাভাইরাস ও বিপন্ন পৃথিবী।

পৃথিবীতে কমেছে মানুষের আস্ফালন অহঙ্কার (এক) করোনাভাইরাসে লকডাউনের প্রভাব : দেশে দেশে শত শত কোটি মানুষ ঘরবন্দি- পৃথিবী এখন কাঁপছে কম : বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ করোনার ভয়-আতঙ্কে কাবু তাবৎ বিশ্ববাসী। তাই পৃথিবীকে সারাক্ষণ অস্থির করে রেখে মানুষ এখন আর দাপিয়ে বেড়ায় না। কমেছে মানুষের অহঙ্কার আস্ফালন সদদ্ভে বিচরণ। করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) বৈশ্বিক মহামারি সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে শত শত কোটি মানুষ এখন কাজকর্ম ছেড়ে বাড়িঘরে ঠায় বসে আছে। নিজেকেই বন্দি করে নিয়েছে সে। এরফলে এই পৃথিবীর গতিবিধি বদলে গেছে। অবিরত যাচ্ছেও। কারণ মানুষ বাইরে যাচ্ছেনা বলেই গাড়ি ট্রেন ভারী যান্ত্রিক সব বাহন চলছে খুবই কম। লাখ লাখ ভারী শিল্প-কারখানা এখন বন্ধ। এর সুপ্রভাবে ভূ-পৃষ্টের উপর চাপ কমে গেছে অনেক। এরফলে পৃথিবী এখন কাঁপছে কম। বিশ্বখ্যত বিজ্ঞানীদের চলমান গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ তথ্য সূত্রে একথা জানা গেছে। সমগ্র পৃথিবীর ওজন ছয় বিলিয়ন ট্রিলিয়ন মেট্রিক টন। আর সেই পৃথিবী নামক বাসযোগ্য গ্রহটি সাড়ে ৭ শ’ থেকে আটশ কোটি মানুষকে ধারণ করে আছে। সেই বিবেচনায় পৃথিবীর কম্পন হ্রাস ও অন্যান্য ইতিবাচক নাটকীয় পরিবর্তন বিস্ময়কর বলছেন বিজ্ঞানীগণ। বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ‘নিউজউইক’র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক ‘করোনাভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবীর কম্পন অনেকটাই কমে গেছে’ শীর্ষক এক নিবন্ধে বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী লকডাউন অবস্থা চলছে। আর সেই সুবাদে ভারী শিল্প-কারখানার যন্ত্রপাতির চলাচল, ভারী যানবাহন গাড়িবহরের মতো বিশাল এক পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় পৃথিবীপৃষ্ঠ এখন কাঁপছে কম। ভূকম্প বা ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করছেন, মানুষের অবাধ বিচরণ, কোলাহল এবং তাদের ব্যবহৃত সব যান্ত্রিক সরঞ্জামের চলাচল অনেকটাই এখন বন্ধ। এরফলে মানুষেন ঠিকানা পৃথিবী নামক এই গ্রহটির পিঠের উপর সিসমিক আওয়াজ তথা ভূতাত্ত্বিক কম্পনজনিত আওয়াজ এখন অনেকাংশেই কমে গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বর্তমান সময়গুলোতে বিশ্বজুড়ে যানবাহনের বহর, শিল্প-কল, কারখানাসহ হরেক যন্ত্রপাতির চলাচল বা ব্যবহার বন্ধ থাকার ফলে পৃথিবীতে গত ২০১৯ সালের তুলনায়ও অন্ততপক্ষে ৫০ শতাংশ বিষাক্ত কার্বন গ্যাসের নিঃসরণ হ্রাস পেয়েছে। আর সেই সঙ্গে বিশাল আকারে বিশ্বে শিল্পখাতের যন্ত্রপাতির ব্যবহার থমকে যাবার ফলে ভূপৃষ্ঠের কম্পন হার অনেকাংশে কমে গেছে। বেলজিয়াম রয়্যাল ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের বিজ্ঞানী থমাস লেকখ বলছেন, ‘ভূকম্পন মাত্রা হ্রাসের বিষয়টি আমরা বেলজিয়ামেও লক্ষ্য করছি’। যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজের বিজ্ঞানী স্টিফেন হিকস বলেছেন, ‘গত বেশ কয়েক সপ্তাহ যাবৎ এটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে যে, ভূপৃষ্ঠের কম্পনমাত্রা এখন নিচের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। কেননা সকালবেলা থেকেই মানুষের সেই আগের কোনো কোলাহল ও জনজট আর নেই। যুক্তরাজ্যের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তাত্ত্বিক ও পাথুরে পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ইয়ান মেইন বললেন, মানুষের যানবাহন ও শিল্প-কারখানার যান্ত্রিক ব্যবহার লকডাউনের কারণে বন্ধ থাকায় পৃথিবীতে আওয়াজ-কম্পন হ্রাস পেয়েছে। এটি সত্যিই বিস্ময়কর ঘটনা। বিজ্ঞানীদের এ নিয়ে গবেষণা চলছেই। চরমান গবেষণার বরাত দিয়ে বিবিসির অপর এক সংবাদ ভাষ্যে বলা হয়, পৃথিবীর কাঁপুনি যে কমে গেছে তা প্রথম লক্ষ্য করেন বেলজিয়ামের রয়্যাল অবজারভেটরির বিজ্ঞানীগণ। তারা বলছেন- ‘লকডাউনের আগের তুলনায় ১-২০ হার্টস ফ্রিকোয়েন্সিতে (বডসড় একটি অর্গানের আওয়াজের যে ফ্রিকোয়েন্সি) ভূ-পৃষ্ঠের দুলুনি এখন অনেক কম।’ শুধুই বেলজিয়াম নয়। পৃথিবী পৃষ্ঠের এই পরিবর্তন সারা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ভূকম্পন কমার বিষয়টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ব্যাধিকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণার পর থেকেই মানুষের বেপরোয়া বিচরণ, কোলাহল বেশ থমকে যেতে থাকে। এমনকি বাংলাদেশের খুব কাছের দেশ হিমালয়কন্যা নেপালের ভূকম্প-বিদরা একই প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন। প্যারিস ইন্সটিটিউট অব আর্থ ফিজিক্সের একজন গবেষক বলেন, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভূকম্পন ‘নাটকীয় মাত্রায়’ কমে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলস শহরে কাঁপুনি কমে যাওয়ার মাত্রা দেখে বিস্মিত হয়েছেন ক্যাল টেক ইউনিভার্সিটির গবেষকগণ। এখানেই শেষ নয়। মানুষের বেপরোয়া দাপাদাপি অনেকটা বন্ধ কিংবা হ্রাসের সুবাদে এখন আগের চেয়ে বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাতাস, বায়ুমণ্ডল। শান্ত অবস্থা বিরাজ করছে সাগর-মহাসাগর রাজ্য্রে। লকডাউনে যে ভূকম্পন কমেছে তাই নয়, প্রকৃতিও বদলে গেছে। স্যাটেলাইটের চিত্রে দেখা গেছে, পরিবেশ দূষণের পেছনে যার বড় দায় বা কারণ সেই নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড গ্যাস এখন বাতাসে অনেক কম। কারণ বাস-ট্রাক-গাডি-লরি কল-কারখানার ধোঁয়া এখন অনেক কম। জাহাজ চলাচল কমে গেছে অনেকটাই। এরফলে সাগর-মহাসাগরে এখন শব্দ অনেক কম। সারা পৃথিবীতে শব্দও এখন অনেক কম। যে বিজ্ঞানীগণ শব্দদূষণ মাপেন বা মহাসাগরের শব্দ নিয়ে গবেষণা করেন, তারা একবাক্যে বলছেন পৃথিবীতে আওয়াজ এখন অনেক কম। পরিষ্কার সিগন্যাল। অবশ্য পৃথিবীর কম্পন মাত্রা কমলেও একদম যে স্থির হঢে গেছে তা বলা যাবে না। তবে গতিবিধির এই পরিবর্তনে কৌতূহলী হয়ে পড়েছেন বিজ্ঞানীগণ। মানুষের নানা গতিবিধির কারণে এত প্রকাণ্ড শব্দ তৈরি হয় যে, পৃথিবী ও প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ তাদের জন্য কষ্টকর। পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ ৭০ কিলোমিটার পুরু। তারপরও মানুষের গতিবিধি দাপিয়ে বেড়ানোর মতো সব কর্মকাণ্ডে এটি কাঁপে। ওঢাশিংটন ইনকর্পোরেটেড রিসার্চ ইন্সটিটিউট ফর সিসমোলজির বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডি ফ্রাসেটো বলছেন- ‘এখন আপনি এমন সিগন্যাল পাচ্ছেন যাতে কোলাহল অনেক কম। ফলে ঐ সব সিগন্যালের ডেটা বিশ্লেষণ এখন সহজতর হচ্ছে’। কিছু বিজ্ঞানী সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পেয়েছেন যে, কেন একেকটি এলাকায় ভূকম্পন কমেছে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের স্টিভেন হিক্স বলছেন- ‘লন্ডন এবং ওয়েলসের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মহাসড়ক এম-ফোরের উপর গাড়ি চলাচল কমে গেছে। ফলে ওই মহাসড়কের দুই ধারের এলাকাগুলোতে ভূকম্পন অনেকটাই কমেেেছ। এখন যেটা হচ্ছে তা হলো সারা পৃথিবীব্যাপী কয়েক সপ্তাহ বা কোথাও কোথাও মাসজুড়ে মানুষের গতিবিধি অনেকটাই কম হওয়ার কারণেই। আর তাতে পৃথিবীর উপর যে চাপ কমেছে তার নজির বিরল।